৩০ কোটি বাংলাভাষী গেমার, তবুও অদৃশ্য: বড় এস্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো কি সত্যিই এই বাজার দেখতে পাচ্ছে না?
চলুন একটু ভাবি।
স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন মানুষ। Riot Games, ESL, এমনকি Twitch — সবাই স্প্যানিশ-ভাষিক কমিউনিটির জন্য আলাদা টিম, আলাদা কন্টেন্ট, আলাদা ট্যুর্নামেন্ট নিয়ে এসেছে। ফ্রেঞ্চ, জার্মান, পর্তুগিজ — সব ভাষার জন্যই এস্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রির মাথাব্যথা আছে।
আর বাংলা? ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। এবং বৈশ্বিক এস্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলোর কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন।
এটা অবহেলা না, এটা একটা বিশাল ব্যবসায়িক ভুল।
সংখ্যাটা বুঝুন আগে
বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে আরও কয়েক কোটি। এর বাইরে US, UK, Canada, Australia-তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি ও ভারতীয় বাঙালি ডায়াস্পোরা — যাদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক বেশি।
শুধু বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখন ১২ কোটির বেশি। মোবাইল গেমিং ব্যবহারকারী? সেটা ৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
US-এ বসবাসকারী বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির কথাই ধরুন — নিউ ইয়র্ক, টেক্সাস, মিশিগানে লক্ষাধিক বাংলাভাষী মানুষ আছেন যারা ইংরেজি কন্টেন্টও বোঝেন, কিন্তু নিজের ভাষায় কন্টেন্ট পেলে সেটাকে বুকে আঁকড়ে ধরেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো — কেউ কি এই মানুষগুলোর দিকে তাকাচ্ছে?
বড় ব্র্যান্ডগুলো কী করছে (বা করছে না)
Riot Games Valorant লঞ্চ করেছে। তাদের APAC বিভাগ আছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় অফিশিয়াল কোনো কন্টেন্ট? নেই।
EA Sports FC (আগের FIFA) প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার মার্কেটিংয়ে ঢালে। বাংলায় একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট? খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ESL Gaming, BLAST Premier, PGL — এই বড় টুর্নামেন্ট অর্গানাইজারদের কাছে দক্ষিণ এশিয়া মানে মূলত ভারত, এবং ভারত মানে হিন্দি। বাংলা সেই হিসেবেও নেই।
Twitch-এর পার্টনার প্রোগ্রামে বাংলা স্ট্রিমারদের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। YouTube Gaming বাংলাদেশে monetization-এর শর্ত এতটাই কঠিন রেখেছে যে অনেক ক্রিয়েটর হতাশ হয়ে ছেড়ে দেন।
এটা কি শুধু অজ্ঞতা, নাকি আরও কিছু?
সরাসরি বলতে গেলে — দুটোই।
এক দিক থেকে, পশ্চিমী এস্পোর্টস কোম্পানিগুলো এখনও তাদের "গ্লোবাল" স্ট্র্যাটেজি মানে ইউরোপ + উত্তর আমেরিকা + পূর্ব এশিয়া (চীন, কোরিয়া, জাপান) বলে মনে করে। দক্ষিণ এশিয়া তাদের কাছে একটা "emerging market" — ভবিষ্যতে দেখা যাবে মনোভাবের।
আরেক দিক থেকে, বাংলা মার্কেটে প্রবেশ করার জন্য যে লোকাল রিসার্চ, লোকাল পার্টনারশিপ এবং কালচারাল বোঝাপড়া দরকার, সেটায় বিনিয়োগ করতে এই কোম্পানিগুলো এখনও তৈরি নয়।
কিন্তু এই যুক্তিটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। কারণ ডেটা এখন স্পষ্ট।
বাংলা কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা একাই লড়ছেন
এই শূন্যতাটা পূরণ করছেন বাংলা-ভাষী কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা — কোনো বড় ব্র্যান্ডের সাহায্য ছাড়াই।
ইউটিউবে বাংলা গেমিং চ্যানেলগুলো লক্ষ লক্ষ সাবস্ক্রাইবার পাচ্ছে। ফেসবুক গেমিং-এ বাংলাদেশি স্ট্রিমাররা প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক টানছেন। TikTok-এ বাংলা গেমিং কন্টেন্ট ভাইরাল হচ্ছে।
এই ক্রিয়েটররা নিজেদের পকেটের পয়সায় সরঞ্জাম কিনছেন, নিজেরাই এডিট করছেন, নিজেরাই কমিউনিটি বিল্ড করছেন। কিন্তু বড় স্পনসরশিপ? সেটা পাচ্ছেন না, কারণ বড় ব্র্যান্ডগুলো এখনও বাংলা মার্কেটকে "ছোট" মনে করছে।
একজন বাংলাদেশি ইউটিউবার যিনি ৫ লাখ সাবস্ক্রাইবার নিয়ে কাজ করছেন, তিনি বললেন — "আমি একই কাজ করছি যা একজন ৫ লাখ সাবস্ক্রাইবারের ইংরেজি চ্যানেল করছে। কিন্তু আমার স্পনসরশিপ রেট তার এক-দশমাংশ। কারণ ব্র্যান্ডগুলো বাংলা অডিয়েন্সকে ভ্যালু করে না।"
ডলারের হিসাব: কত বড় সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে?
শুধু বাংলাদেশের মোবাইল গেমিং মার্কেটের আকার ২০২৪ সালে আনুমানিক ৩০০-৪০০ মিলিয়ন ডলার। এটা দ্রুত বাড়ছে।
US-এ বাংলাদেশি ডায়াস্পোরার গড় আয় জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। এই মানুষগুলো গেমিং পেরিফেরাল, সাবস্ক্রিপশন, ইন-গেম পার্চেজে টাকা খরচ করতে রাজি — কিন্তু তাদের ভাষায় কেউ কথা বলছে না।
একটা সহজ তুলনা দেওয়া যাক: Twitch-এ স্প্যানিশ স্ট্রিমিং সেগমেন্টে বিনিয়োগ করার পর Twitch-এর LATAM ব্যবহারকারী সংখ্যা কয়েক বছরে তিনগুণ হয়েছে। বাংলা সেগমেন্টে একই বিনিয়োগ করলে ফলাফল কী হতে পারে — সেটা ভাবলেই মাথা ঘুরে যায়।
তাহলে সমাধান কী?
আমরা এখানে বড় ব্র্যান্ডগুলোকে দোষ দিয়ে শেষ করতে চাই না। বরং কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রাখতে চাই।
প্রথমত, বাংলা সোশ্যাল মিডিয়া প্রেজেন্স তৈরি করুন। Riot, EA, Activision — তোমাদের একটা বাংলা Twitter/X অ্যাকাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে? প্রায় শূন্য।
দ্বিতীয়ত, লোকাল ক্রিয়েটরদের সাথে পার্টনারশিপ করুন। বাংলা গেমিং ইউটিউবার ও স্ট্রিমারদের স্পনসর করুন। এটা কার্যকর এবং তুলনামূলক সস্তা মার্কেটিং।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে রিজিওনাল টুর্নামেন্ট আয়োজন করুন। ছোট প্রাইজ পুল দিয়েও শুরু করা যায় — কমিউনিটি এনগেজমেন্টের মূল্য অনেক বেশি।
শেষ কথা: এই উপেক্ষার একটা মেয়াদ আছে
বাংলা গেমিং কমিউনিটি বড় ব্র্যান্ডগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে বসে নেই। ইস্পোর্টস বাংলার মতো প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় টুর্নামেন্ট অর্গানাইজার, এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা নিজেদের ইকোসিস্টেম নিজেরাই গড়ে তুলছেন।
কিন্তু যে ব্র্যান্ডগুলো এখন এই মার্কেটে আসবে, তারাই ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। আর যারা আরও দেরি করবে — তারা দেখবে যে জায়গাটা অন্য কেউ নিয়ে নিয়েছে।
৩০ কোটি মানুষকে আর কতদিন উপেক্ষা করা যায়?