ইস্পোর্টস বাংলা All articles
প্লেয়ার প্রোফাইল

অদৃশ্য চ্যাম্পিয়নরা: দক্ষিণ এশিয়ার নারী গেমাররা যেভাবে বিশ্বমঞ্চ কাঁপাচ্ছেন, অথচ আমেরিকার মিডিয়া টের পাচ্ছে না

ইস্পোর্টস বাংলা
অদৃশ্য চ্যাম্পিয়নরা: দক্ষিণ এশিয়ার নারী গেমাররা যেভাবে বিশ্বমঞ্চ কাঁপাচ্ছেন, অথচ আমেরিকার মিডিয়া টের পাচ্ছে না

২০২৩ সালের শেষের দিকে, ঢাকার একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে Tasnim "PhantomX" Akter তার VALORANT র‍্যাংক Radiant-এ নিয়ে গেছেন। সে রাতে তার স্ক্রিনশট সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল — কিন্তু শুধুমাত্র বাংলাদেশের গেমিং কমিউনিটিতে। ESPN Esports? Dot Esports? The Loadout? কোথাও একটা লাইনও পড়েনি।

এই গল্পটা শুধু Tasnim-এর না। এটা দক্ষিণ এশিয়ার শত শত নারী গেমারের গল্প, যারা প্রতিদিন গ্রাইন্ড করছেন, টুর্নামেন্ট জিতছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক স্পটলাইটের বাইরেই থেকে যাচ্ছেন।

সংখ্যাগুলো যা মিডিয়া এড়িয়ে যায়

Newzoo-র ২০২৩ রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল গেমারদের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ৩৮% ছেড়ে গেছে — যেটা মাত্র পাঁচ বছর আগেও ছিল ২২%-এর নিচে। বাংলাদেশে BGMI (Battlegrounds Mobile India-এর বাংলাদেশ সংস্করণ) এবং Free Fire টুর্নামেন্টে নারী দলের সংখ্যা ২০২১ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে প্রায় তিনগুণ হয়েছে।

ভারতের দিকে তাকালে ছবিটা আরও স্পষ্ট। ESL India Premiership-এর ২০২২ ও ২০২৩ সিজনে নারী খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ রেকর্ড ছুঁয়েছে। Team Velocity-র নারী VALORANT রোস্টার Asian Esports Championships-এ কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে — এবং সেই খবর Dot Esports বা Upcomer-এ কোথাও জায়গা পায়নি।

কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই লেখা।

"আমাদের গল্প বলার কেউ নেই"

কলকাতার গেমার Priyanka "StormByte" Ghosh PUBG Mobile-এ South Asia Regional Championship-এ তার দলকে Runner-up করিয়েছেন। আমরা যখন তার সাথে কথা বলি, তিনি বললেন, "ম্যাচের পরদিন আমার ইনস্টাগ্রামে মেসেজ এসেছে হাজারে হাজারে। কিন্তু কোনো বড় ইংরেজি মিডিয়া আমাকে ইন্টারভিউ করতে আসেনি। এমনকি কোনো ইংরেজি আর্টিকেলেও আমার নাম উঠেছে কিনা জানি না।"

এই অভিজ্ঞতাটা isolated না। আমরা বাংলাদেশ ও ভারতের ১৫ জন নারী প্রো গেমারের সাথে কথা বলেছি, এবং প্রায় সবাই একই কথা বলেছেন — তাদের সাফল্যের গল্পটা স্থানীয় ভাষায় কিছুটা ছড়ায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছায় না।

মিডিয়া ব্যর্থতার কাঠামোগত কারণ

আমেরিকার মূলধারার এস্পোর্টস মিডিয়া মূলত তিনটি গেম ইকোসিস্টেমকে কেন্দ্র করে ঘোরে — League of Legends, VALORANT (North American/European সার্কিট), এবং CS2। এই তিনটিতে দক্ষিণ এশিয়ার দলগুলোর সরাসরি অ্যাক্সেস সীমিত, কারণ Riot ও Valve-এর রিজিওনাল স্ট্রাকচার দক্ষিণ এশিয়াকে আলাদা ও ছোট বাজার হিসেবে দেখে।

ফলে যা হয়: দক্ষিণ এশিয়ার নারী গেমাররা Free Fire, BGMI, বা Mobile Legends-এ দুর্দান্ত পারফর্ম করলেও, সেই গেমগুলো আমেরিকান মিডিয়ার "রাডারে" থাকে না। এটা একটা সার্কুলার সমস্যা — কভারেজ নেই বলে স্পনসর নেই, স্পনসর নেই বলে বড় টুর্নামেন্টে যাওয়ার সুযোগ নেই, বড় টুর্নামেন্ট নেই বলে কভারেজ নেই।

জেন্ডার ডাইনামিক্স: দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব চ্যালেঞ্জ

তবে এই অদৃশ্যতার দায় শুধু পশ্চিমা মিডিয়ার না। দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব সামাজিক কাঠামোও এখানে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবারে মেয়েদের গেমিংকে "সময় নষ্ট" বা "ছেলেদের কাজ" হিসেবে দেখা হয়। রাত জেগে প্র্যাকটিস করা, অনলাইনে পুরুষ সতীর্থদের সাথে কথা বলা — এগুলো নিয়ে এখনও সামাজিক প্রশ্ন তোলা হয়। ভারতেও ছবিটা খুব আলাদা না, বিশেষত ছোট শহর বা গ্রামাঞ্চলে।

কিন্তু পরিবর্তনটা আসছে। এবং দ্রুতই আসছে।

মুম্বাইয়ের Nodwin Gaming এবং ঢাকার বেশ কিছু স্থানীয় অর্গানাইজার এখন নারীদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরির টুর্নামেন্ট চালু করেছে। এগুলো "সেগ্রিগেশন" না — এগুলো entry point, যেখান থেকে নারী গেমাররা নিজেদের প্রমাণ করে মিক্সড সার্কিটে আসছেন।

আমেরিকায় বাংলাদেশি ও ভারতীয় ডায়াসপোরার ভূমিকা

US-এ বসবাসকারী বাংলাদেশি ও ভারতীয় কমিউনিটি এই গল্পটা বদলাতে পারে। নিউ ইয়র্ক, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়ায় যে বিশাল দক্ষিণ এশিয়ান গেমিং কমিউনিটি আছে, তারা যদি এই নারী গেমারদের গল্প শেয়ার করা শুরু করে, আমেরিকান মিডিয়ার ওপর চাপ তৈরি হবে।

Reddit-এর r/esports বা r/GlobalEsports-এ দক্ষিণ এশিয়ার নারী গেমারদের নিয়ে পোস্ট প্রায় দেখাই যায় না। এটা বদলাতে হবে — এবং সেটা শুরু করতে হবে আমাদের মতো বাংলা মিডিয়া থেকেই।

শেষ কথা: অদৃশ্যতা চিরকাল থাকে না

PhantomX Tasnim এখন একটি ছোট এস্পোর্টস অর্গানাইজেশনের সাথে ট্রায়াল করছেন। StormByte Priyanka তার নিজের YouTube চ্যানেলে গেমপ্লে কন্টেন্ট বানাচ্ছেন, সেখানে লক্ষাধিক ভিউ হচ্ছে।

এই মেয়েরা থামছেন না। মিডিয়া দেখুক বা না দেখুক, তারা খেলছেন, জিতছেন, এগোচ্ছেন।

আমাদের কাজ হলো এই গল্পগুলো বলা। ইস্পোর্টস বাংলা সেই কাজটাই করতে চায় — বাংলায়, বিশ্বমানে।

All Articles

Related Articles

সব গেমে এক্সপার্ট, কোনো গেমে মাস্টার না: বাংলাদেশের প্রো গেমারদের 'স্পেশালাইজেশন সমস্যা'

সব গেমে এক্সপার্ট, কোনো গেমে মাস্টার না: বাংলাদেশের প্রো গেমারদের 'স্পেশালাইজেশন সমস্যা'

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের দরজা কি দক্ষিণ এশিয়ার গেমারদের জন্য আদৌ খোলা?

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের দরজা কি দক্ষিণ এশিয়ার গেমারদের জন্য আদৌ খোলা?

ইংরেজির দেয়াল: কেন বাংলাভাষী গেমাররা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের হারিয়ে ফেলছেন